
রবিউল হাসান, নোয়াখালী:
নোয়াখালীর সার বাজারগুলো এখন সিন্ডিকেটের দখলে। সরকারি রেটের চেয়েও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে কৃষকদের অতি প্রয়োজনীয় এই পণ্য। এ অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে স্থানীয় কৃষকেরা।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকালে জেলার বেগমগঞ্জ ও সোনাইমুড়ী উপজেলায় ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র।
বেগমগঞ্জ উপজেলায় বিসিআইসি অনুমোদিত ১৭ জন ডিলার থাকার কথা থাকলেও রয়েছে ১০ জন এবং খুচরা বিক্রেতা ২০ জন রয়েছে । ০৬ নং রাজগঞ্জ ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স ওমর ফারুক লাল সার ৩০ টাকা, সাদা ৩০, কালো ৩০, ডেব কেজি ৩০ এবং টিএসপি ৪০ টাকা করে বিক্রি করছেন।
সেতুভাঙ্গা বাজারের সাব ডিলার আধুনিক কৃষি সেবার দিন মোহাম্মদ, লাল সার ২৭ টাকা, সাদা ৩০, কালো ৩০, টিএসপি ৩৫ এবং ডেব কেজিতে ৩০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। এদিকে দক্ষিণ বাজারের জননী বানিজ্য বিতানের মোদি দোকান লাল সার ৩০ টাকা, সাদা ৩২, কালো ৩০, ডেব ৩০ টাকা দরে বিক্রি করছে।
রসুলপুর ইউনিয়নের ডিলার মেসার্স সালা উদ্দিন, তিনিই আবার চৌমুহনী পৌর এলাকার দক্ষিণ বাজারের সাব ডিলার। একই ব্যক্তি ডিলার এবং সাব ডিলার পরিচালনা করা যেনো জাদুর চাদরে মোড়া এক রহস্যের জট। তিনিও লাল সার ৩০ টাকা, সাদা ৩০, কালো ৩০, ডেব কেজি ৩০ এবং টিএসপি ৪০ টাকা করে বিক্রি করছেন।
কুতুবপুর ইউনিয়নের ডিলার সুমন এন্টারপ্রাইজের বটতলায় একটি গোডাউন রয়েছে, আবার রসুলপুর ইউনিয়নের জমিদারহাট বাজারে তিনি খুচরা সার ডিলার। লাল সার বিক্রি করছেন ২০ টাকা, সাদা ২৮, কালো ২৭, ডেব- কেজি ২১, টিএসপি- ২৭।
সোনাইমুড়ীতে কৃষকদের মাঝে সরকারি মূল্যে রাসায়নিক সার বিতরণের জন্য বিসিআইসির ১২ জন এবং খুচরা ৯০ জন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উপজেলার ১০ ইউনিয়নের প্রতিটিতে একজন বিসিআইসির ও ৪ জন বিএডিসির ডিলার রয়েছেন। সার বিপণন নীতিমালা মোতাবেক প্রতিটি ইউনিয়নে ডিলারদের ঘর থাকলেও তা শুধু কাগজে কলমে। খুচরা ডিলারদের সার মজুত রাখার কোন ঘর নেই। তারা মুদি দোকানসহ বিভিন্ন খাদ্যের দোকানে বিভিন্ন পণ্যের পাশাপাশি সার বিক্রি করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৌর বাজারের মেসার্স প্রগতি ড্রেডার্স, মেসার্স ইমাম ব্রাদার্স সহ অন্যান্য ডিলাররা সরকারি রেটের চেয়েও অতিরিক্ত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করছে। লাল সার কেজিতে ২১ টাকার জায়গায় ২৫ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকার জায়গায় ৩৫ এবং ডেব ২০ টাকার জায়গায় ৩০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়াও, জয়াগ বাজারের বিসিআইসি সার ডিলার রেজাউল করিম, সালে আহাম্মদ, নান্দিয়াপাড়া বাজারের নুর হোসেন, সোনাপুর বাজারের মহি উদ্দিন সহ ইউনিয়ন ভিত্তিক অন্যান্য ডিলারদের চিত্র একই।
খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে নদনা বাজারের সাহেদ ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এর পরিচালক নাসির পাটোয়ারী, ডেব সার ২৮ টাকা, লাল ২২ এবং সাদা ২৮ বিক্রি করছে। নিউ পাটোয়ারী স্টোর এর মহি উদ্দিন পাটোয়ারী লাল ২২, জৈব ১৮, টিএসপি ৩৪, সাদা ৩২ টাকা বিক্রি করছে।
এছাড়াও বাংলা বাজারের সাব ডিলার জসিম, জয়াগ বাজারের মেসার্স সিহাব এ্যাগ্রো লাল সার বিক্রি করছে ৩০ টাকায়, জৈব ২০, টিএসপি ৪০ ও সাদা ৩০ টাকা। জয়াগ বাজারের মেসার্স আরাফাত ট্রেডার্স এর কর্মচারী আবুল কালাম জানান, তারা লাল সার ২৭ টাকা, জৈব ২০, টিএসপি ৩৫ এবং সাদা ২৭ টাকা বিক্রি করছে।
বেগমগঞ্জের রসুলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা নুর হোসেন জানান, বর্তমানে সারের দাম বেশি। এ অবস্থায় ফসলি জমি করতে তিনি হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন।
সোনাইমুড়ীর দেওটি ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ খোকা অভিযোগ করে বলেন, নিরোপায় হয়ে তিনি এ বছর ফসলি জমি করছেন না। বাজারে সরকারি দামের চেয়েও বেশি মূল্যে সার বিক্রি করছে ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতারা। কৃষকরা কি করে খাবে। সারের বাজার এমন চলতে থাকলে কৃষি কাজ থেকে ধীরে ধীরে সরে দাড়াবে কৃষকরা। সার বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
বেগমগঞ্জ উপজেলার বিসিআইসি ডিলার সালে উদ্দিন আহমেদ বলেন, সার উত্তোলন থেকে আনা পর্যন্ত বাড়তি টাকা গুনতে হয়। তাই তারা বাধ্য হয়ে সরকারি রেটের চেয়েও কিছু টাকা বেশি নিচ্ছেন।
বেগমগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আবু হানিফ বলেন, উপজেলা অফিস থেকে তারা প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছেন। অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি করার বিষয়ে তার কাছে কোনো অভিযোগ নেই।
সোনাইমুড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, সরকার রেটে লাল সার কেজিতে ২১ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা এবং ডেব ২০ টাকা। ডিলার এবং সাব ডিলাররা যদি বাড়তি দামে সার বিক্রি করে তাহলে তিনি যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।
কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের নোয়াখালীর উপপরিচালক আশীষ কুমার কর বলেন, বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়টি তিনি জানেন না। খোঁজ খবর নিয়ে তিনি ব্যবস্থা নিবেন।